Solution
Correct Answer: Option C
মোগল যুগে শাসকবর্গের ভাষা ছিল ফারসি। প্রশাসনিক ও বিচারিক কাজে ফারসি ভাষা বাধ্যতামূলক হওয়ায় বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এ ভাষার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। সরকারি চাকরি ও উচ্চপদস্থ কর্মসংস্থানের জন্য হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ ফারসি ভাষা শেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এসব ফারসি ভাষায় দক্ষ কর্মচারীদের 'মুন্সী' বলা হতো, যারা কেবল দাপ্তরিক কাজেই নয়, সাহিত্যচর্চাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন।
নবাব, সুবাহদার ও মুসলিম অভিজাত শ্রেণী ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রসারে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ফারসি ছিল শুধু প্রশাসনিক ভাষা নয়, এটি ছিল জ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভাষা। ফারসি ভাষার সমৃদ্ধ সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা, গজল, কিসসা ও সুফি সাহিত্য বাংলার সাহিত্যিকদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বাংলা ভাষায় ফারসি শব্দ, উপমা, অলংকার ও ছন্দের ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফারসির অনুকরণে বাংলায় গজল, সুফি সাহিত্য এবং কিসসা-কাহিনির সৃষ্টি হয়, যা বাংলা সাহিত্যকে নতুন মাত্রা দেয়।
এ সময় বাংলার কবি ও লেখকরা ফারসি সাহিত্যের বিষয়বস্তু ও রচনাশৈলী অনুসরণ করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। হিন্দু কবিদের রচনায় যদিও সংস্কৃত সাহিত্যের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট, তবুও তারা ফারসি সাহিত্যের প্রভাব এড়াতে পারেননি। বৈষ্ণব পদাবলীতে, বিশেষত চৈতন্য-পরবর্তী যুগে, ফারসি শব্দ ও ভাবধারার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মোগল আমলে বাংলায় বাউল গানের উৎপত্তি হয়, যেখানে সুফি দর্শন ও ফারসি ভাবধারা মিশে যায়। এ সময় কবিগান, মর্সিয়া গান, কিসসা-গীত, পালা ও অন্যান্য লোকসাহিত্যে ফারসি ভাষার ছোঁয়া স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
ফারসি ভাষার প্রভাবে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার, সাহিত্যিক রীতি ও ভাবধারা আরও বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। এই যুগে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে ফারসি ভাষা এক অনন্য ভূমিকা পালন করে, যা আজও বাংলা ভাষার ঐতিহ্যে স্মরণীয় হয়ে আছে।